চিনের ওপর আরোপিত বিভিন্ন অসম চুক্তি গুলি বিবরণ দাও?

হ্যালো, আজকে আমরা চিনের ওপর আরোপিত বিভিন্ন অসম চুক্তি এই প্রশ্নের উত্তরটি আজকের এই পোস্টে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করছি । উচ্চমাধ্যমিক এর ইতিহাসের এটি একটি খুব ভালো এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং পরীক্ষাতে এই প্রশ্নটি অনেকবার ই এসেছে তাই প্রশ্নটি মন দিয়ে পড়ুন এবং বন্ধুদের সাথেও শেয়ার করুন ।

এর আগের পোস্টে আমরা পলাশির যুদ্ধের কারণগুলি আলোচনা করেছিলাম ।

চিনের ওপর আরোপিত বিভিন্ন অসম চুক্তি গুলি বিবরণ দাও

চিনের ওপর আরোপিত বিভিন্ন অসম চুক্তি

১৮৩৯ থেকে ১৯৪৯ খ্রীঃ মধ্যে চিং বা কিং দেশের শাসনকালে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান প্রভৃতি বহিরাগত সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি তাদের সামরিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন যুদ্ধে চিনকে পরাজিত করে চিনের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক আধিপত্যের প্রসার ঘটায় ।যুদ্ধে পরাজয়ের সূত্রে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি চিনের ওপর বিভিন্ন শোষণমূলক সন্ধি বা চুক্তি চাপিয়ে দেয় । এই চুক্তিগুলি সাধারণত অসম চুক্তি বা শিক্ষামূলক চুক্তি নামে পরিচিত । এই চুক্তি গুলি হল-

১) নানকিং এর সন্ধি- 1796 খ্রিস্টাব্দে চিন সম্রাট চিয়াং চিং চিনে আফিম ব্যাবহার আমদানি ও আফিম চাষ বেআইনি ঘোষণা করলে মুনাফার লোভে ইংল্যান্ড আফিম বাণিজ্য চালিয়ে যায় । আফিম ব্যাবসাকে কেন্দ্র করে চিন ও ইংল্যান্ডের মধ্যে প্রথম আফিমের যুদ্ধ বা প্রথম ওহিফেন এর যুদ্ধ বাঁধে । যুদ্ধের পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে চিন 1842 খ্রীঃ নাঙ্কিং এর চুক্তি স্বাক্ষর করে । চুক্তি দ্বারা – ১) চিনের হং কং বন্দরটি কিছুকালের জন্য ইংল্যান্ডের হাতে ছেড়ে দেওয়া হত । ২) ক্যান্টন, সাংহাই, ফুচাও, অ্যাময় ও নিম্পো এই পাঁচটি বন্দর ইউরোপীয় বাণিজ্য বসবাসের জন্য খুলে দেওয়া হয় ।

২) বগের চুক্তি- ১) ব্রিটিশ সরকার নানকিং এর চুক্তির কিছুকাল পর 1843 খ্রীঃ বগের চুক্তি স্বাক্ষর করে চিনের সঙ্গে চুক্তি দ্বারা স্থির হয় ব্রিটেন চিনে কিছু অতিরাষ্ট্রিক অধিকার লাভ করে এবং অন্য কোন বিদেশী রাষ্ট্রকে ভবিষ্যৎ থেকে সুযোগ সুবিধা দেবে সেগুলি ব্রিটেন কে দিতে রাজি হয় ।

৩) ওয়াং ভিয়ার চুক্তি- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল চিনের কাছ থেকে বাণিজ্যিক সুযোগ সুবিধা লাভের জন্য 1844 খ্রীঃ ওয়াং ভিয়ার চুক্তি চাপিয়ে দেয় । এই চুক্তি দ্বারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চিনের সঙ্গে বিভিন্ন অতিরাষ্ট্রিক লাভ করে । চিনের চুক্তি বন্দরগুলিতে বসবাসকারী বিদেশীরা আইনগত, বিচারবিভাগীয়, পুলিশ সংক্রান্ত ও কর সঙ্ক্রান্ত বিষয়ে স্বাধীনতা লাভ করে ।

৪) হোয়াম পোয়া- দুর্বল চিনের ওপর ফ্রান্স ব্রিটেনের বাণিজ্যিক সুযোগ সুবিধা লাভের জন্য 1844 খ্রীঃ হোয়াম পোয়া চুক্তি চাপিয়ে দেয় । চুক্তি দ্বারা ১) ফরাসী বণিকদের জন্য চিনের নতুন পাঁচটি বন্দর খুলে দেওয়া হয় এবং চিন ও ফরাসীদের মধ্যে বাণিজ্যিক শুল্ক নির্দিষ্ট হয় । ২) ফ্রান্স কিছু অতিরাষ্ট্রিক অধিকার লাভ করে ।

৫) আইগুণ এর সন্ধি- 1858 খ্রীঃ রাশিয়া চিনকে আইগুণের সন্ধি সাক্ষরে বাধ্য করে । সন্ধির দ্বারা স্থির হয় – ১) আমুর নদীর উত্তর দিকের সমস্ত চিনা জমিতে রাশিয়ার আধিপত্য থাকবে এবং ২) রাশিয়া বাণিজ্যের জন্য উরগা ও কাশগড় উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় ।

৬) টিয়েনসিনের সন্ধি- পিকিং এর দূতাবাস নির্মাণ, নতুন অঞ্চল বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্তকরণ প্রভৃতির দাবিতে 1856 খ্রীঃ ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স চিনের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় আফিমের যুদ্ধ সংঘটিত করে যুদ্ধে পরাজিত চিন ও ইংল্যান্ড ফ্রান্সের সঙ্গে 1858 খ্রীঃ টিয়েনসিনের সন্ধি সাক্ষরে বাধ্য হয় । সন্ধির শর্ত দ্বারা বিদেশী বণিকদের জন্য আরও ১১টি বন্দর খুলে দিতে হয় এবং বিদেশীরা চিনের যেকোন জায়গায় ভ্রমন ও বসবাসের ও ধর্মপ্রচারের অধিকার পায় । আফিম ব্যাবসাকে আইন সম্মত করা হয় । রাজধানী পিকিং এর বিদশী দূতাবাস স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় ।

৭) পিকিং এর সন্ধি- চিন সম্রাট সিয়েন সন্ধি টাল বাহনা করলে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের যৌথ বাহিনী 1860 খ্রীঃ পিকিং দখল করেন এবং চিন সম্রাট কুং পিকিং এর সন্ধি সাক্ষরে বাধ্য হয় । শর্ত- ১) টিয়েনশিন বিদেশীদের জন্য উন্মুক্ত হয় এবং ব্রিটেন কলুন দ্বীপ লাভ করে ।

৮) শিমোনসিকের সন্ধি- কোরিয়াকে কেন্দ্র করে চিন জাপানের মধ্যে চিন পরাজয় হয় 1895 খ্রীঃ শিমোনসিকের সন্ধি সাক্ষরে বাধ্য হয় । সন্ধির শর্তানুযায়ী -১) কোরিয়া চিনকে স্বাধীনতা দেয় । ২) জাপান চিনের কাছ থেকে তাইওয়ান, লিয়াং টুং, পোর্ট আরথার লাভ করেন ।

৯) বক্সার প্রোটোকল- বিদেশী শক্তি গুলির শোষণ ও আধিপত্যের আইহো চুয়াং নামে এক গুপ্ত সমতি বক্সার বিদ্রোহের সূচনা করে (1899-1901) বিদেশী শক্তিগুলি এই বিদ্রোহ দমন করে চিনের ওপর বক্সার বিদ্রোহ চাপিয়ে দেয় । যার দ্বারা বিদ্রোহের সাথে যুক্ত ১২ জনকে প্রাণদ্বন্ড দেওয়া হয় । পিকিং এর দূতাবাস গুলিতে বিদেশী সেনা নিযুক্ত হন । চিনে অস্ত্র সস্ত্র নির্মাণ ও অস্ত্র সস্ত্র আমদানি দুবছরের জন্য নিষিদ্ধ হয় ।

আরও পড়ুন-

বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল আলোচনা কর

আধুনিক ইতিহাসের লিখন পদ্ধতি আলোচনা কর

গুপ্ত যুগের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য এবং শিল্পকলা

Leave a Comment