আগ্নেয় পর্বত কাকে বলে, উৎপত্তি, প্রকারভেদ এবং বৈশিষ্ট্য

আজকে আমরা আগ্নেয় পর্বত বা সঞ্চয়জাত পর্বত কাকে বলে, উৎপত্তি, প্রকারভেদ এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করবো ।

আগ্নেয় পর্বত বা সঞ্চয়জাত পর্বত কাকে বলে ?

পৃথিবীর অভ্যন্তরের উত্তপ্ত গলিত পদার্থ বা ম্যাগমা কখনাে  কখনাে ভূত্বকের কোনাে গভীর ফাটল বা সুড়ঙ্গ পথ ধরে ওপরে উঠে আসে এবং নির্গমন মুখের চারধারে স্তুপীকৃত হয়ে জমতে জমতে পর্বতের আকার ধারণ করে । এইভাবে আগ্নেয় পদার্থ সঞ্চয়ের ফলে সৃষ্টি হয় বলে একে আগ্নেয় পর্বত বা সঞ্চয়জাত পর্বত বলা হয় ।

আগ্নেয় পর্বত

কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আগ্নেয় পর্বত বা সঞ্চয়জাত পর্বত এর উদাহরণ হল – জাপানের ফুজিয়ামা , ইতালির ভিসুভিয়াস ।

আগ্নেয় পর্বত বা সঞ্চয়জাত পর্বত এর প্রকারভেদ

গঠন ও আকৃতি অনুসারে আগ্নেয় পর্বত কে চার ভাগে ভাগ করা যায় । যথা ১) শঙ্কু আকৃতির আগ্নেয়গিরি ২) গম্বুজ আকৃতির আগ্নেয়গিরি ৩) বিস্ফোরণ জ্বালামুখবিশিষ্ট আগ্নেয়গিরি ৪) কম্পােজিট বা বিমিশ্র জাতীয় আগ্নেয়গিরি ।

১) শঙ্কু আকৃতির আগ্নেয়গিরি

অনেক সময় ভূগর্ভ কে উৎক্ষিপ্ত শিলাখণ্ড ও ভস্ম (পাইরোক্লাস্ট) জ্বালামুখের চারপাশে সঞ্চিত হয়ে শঙ্কু বা মােচা আকৃতির আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি করে। এজন্য একে অনেকসময় পাইরােক্লাস্ট শঙ্কুও বলা হয়। এই জাতীয় আগ্নেয়গিরির ঢাল সাধারণত উত্তল হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যেসব পদার্থের দ্বারা এই প্রকার আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি হয়, সেগুলির আকৃতি যদি বড়াে হয় তবে আ্নেয়গিরির ঢাল বেশি খাড়া এবং সৃক্ষ্ম পদার্থের দ্বারা গঠিত হলে কম খাড়া হয়।
যেমন-মেক্সিকোর পারিকুটিন আগ্নেয়গিরি ।

২) গম্বুজ আকৃতির আগ্নেয়গিরি

কোনাে কোনা সময় বড়াে ধরনের বিস্ফোরণের পরিবর্তে ভূপৃষ্ঠের কোনো ফাটল বা ছিদ্রপথে ঘন লাভা ধীরে ধীরে নির্গত হয় এবং জ্বালামুখের চারপাশে সঞ্চিত হয়ে বিশালাকার গম্বুজ আকৃতির আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি করে। এর ঢাল খুব কম হয়। যেমন-হাওয়াই দ্বীপের মৌনালােয়া আগ্নেয়গিরি।

৩) বিস্ফোরণ জ্বালামুখবিশিষ্ট আগ্নেয়গিরি

অনেকসময় এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠের শিলাখণ্ড উৎক্ষিপ্ত হয়ে একটি বড়াে ধরনের গহ্বর বা গর্ত সৃষ্টি হয় এবং তার চারপাশে শিলাখণ্ড সঞ্জিত হয়ে একটি নিন্ন জ্বালামুখবিশিষ্ট (low crater ring) আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি করে যেমন-আইসল্যান্ডের ক্রাফলা আগ্নেয়গিরি।

৪) কম্পােজিট বা বিমিশ্র জাতীয় আগ্নেয়গিরি

অনেকদিন ধরে ছােটোবড়াে নানা ধরনের অগ্ন্যুৎপাত হলে এই জাতীয় আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি হয়। অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে উৎক্ষিপ্ত শিলাখণ্ড ছিদ্রপথের চারপাশে জমা হয় এবং পরে তার ওপর লাভাপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়ে। এইভাবে বারে বারে অগ্নুৎপাতের ফলে আগ্নেয়গিরি ক্রমশ উঁচু হয়ে যায় এবং তার গায়ে অনেকগুলি স্তর সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর অধিকাংশ আগ্নেয়গিরি এই জাতীয়। যেমনজাপানের বিখ্যাত ফুজিয়ামা আগ্নেয়গিরি।

Fuji Mountain Japan - Free photo on Pixabay
ফুজিয়ামা

🔸  আগ্নেয় পর্বত বা সঞ্চয়জাত পর্বত এর উৎপত্তি 🔸 

কোনাে কোনাে সময় ভূপৃষ্ঠের ৮০ থেকে ১৬০ কিলােমিটার নীচে অস্বাভাবিক তাপ বৃদ্ধির ফলে ভূগর্ভস্থ পদার্থ সমূহ গলে তরল শিলাস্রোত বা ম্যাগমার সৃষ্টি হয় এবং প্রচণ্ড গ্যাসের উদ্ভব হয় । গ্যাসের চাপ খুব বেশি বৃদ্ধি পেলে ওই ম্যাগমা তখন ভূত্বকের কোনাে ফাটল বা সুড়ঙ্গ পথ ধরে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসে এবং লাভারূপে ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে ।

তবে শুধু লাভা নয় , তার সঙ্গে নানা ধরনের গ্যাস , ছাই , ভস্ম , পাথর টুকরাে , জলীয় বাষ্প প্রভৃতিও নির্গত হয় । বারবার উত্তপ্ত শিলাস্রোত বা ম্যাগমা নির্গত হয়ে ফাটল বা সুড়ঙ্গের চারপাশে জমা হলে তা খুব উঁচু হয়ে যায় এবং একসময় শঙ্কু আকৃতির পর্বতের আকার ধারণ করে । এইভাবে আগ্নেয় পদার্থ সমূহ সঞ্চয় এর ফলে সৃষ্টি হয় আগ্নেয় পর্বত বা সঞ্চয়জাত পর্বত

🔸আগ্নেয় পর্বত বা সঞ্চয়জাত পর্বত এর বৈশিষ্ট্য🔸

  • আগ্নেয় পর্বতের আকৃতি কিছুটা ত্রিভুজ বা শঙ্কুর মতাে দেখতে হয় ।
  • এর চূড়ায় একটি মুখ থাকে , একে জ্বালামুখ বলে ।
  • বড়াে বড়াে আগ্নেয়গিরির একাধিক জ্বালামুখ থাকে । এগুলির মধ্যে প্রথম যে মুখটি দিয়ে অগ্ন্যুৎপাত হয় , তাকে প্রধান বা মুখ্য জ্বালামুখ এবং পরবর্তীকালে অন্য যেসব মুখ সৃষ্টি হয় সেগুলিকে অপ্রধান বা গৌণ জ্বালামুখ বলে ।
  • জ্বালামুখ একটি নলাকৃতি পথের মাধ্যমে ভূগর্ভের ম্যাগমা গহ্বরের সঙ্গে যুক্ত থাকে । 
  • আগ্নেয় পর্বতের চারপাশে যথেষ্ট খাড়া ঢাল থাকে ।
  • আগ্নেয় পর্বতের উচ্চতা মাঝারি ধরনের হয় ।
  • ভূপৃষ্ঠের দুর্বল অংশ বা পাত সীমানা বরাবর আগ্নেয় পর্বত দেখা যায়।
  • আগ্নেয় পার্বত্য অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ।
  • আগ্নেয় শিলা, ভস্ম, সিন্ডার প্রভৃতি দিয়ে আগ্নেয় পর্বত গঠিত।

🔸আগ্নেয় পর্বত বা সঞ্চয়জাত পর্বত এর বণ্ঠন🔸

জীবন্ত ও মৃত সব ধরনের আগ্নেয়গিরি পৃথিবীর। তিনটি নির্দিষ্ট বলয়ের মধ্যে দেখা যায়। পাতসীমানার সাথে আগ্নেয়গিরির সম্পর্ক যেহেতু সুগভীর, তাই ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলিতেই অধিকাংশ আগ্নেয়গিরি অবস্থান করছে।

১। প্রশান্ত মহাসাগরীয় বলয় :- পৃথিবীর মােট আগ্নেয়গিরির ৮০% রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের উভয় পাশে। প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমে এই বলয়ের বিস্তার উত্তরে সাখালিন, কামচাটকা থেকে জাপান, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া হয়ে দক্ষিণে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত এবং প্রশান্ত । মহাসাগরের পূর্বে এর বিস্তার দক্ষিণে আন্ট্যাকটিকা থেকে আন্দিজ, রকি পর্বত হয়ে আলাস্কা পর্যন্ত। এই বলয়টিতে অসংখ্য আগ্নেয়গিরির অবস্থানের কারণে এটি ‘প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় (Fire Girdle of the Pacific) নামে পরিচিত মহাসাগরের উভয় পার্শ্ব্থ অংশ পাতসীমানা অঞ্ল। এই অংশে পাতদ্বয়ের সংঘর্ষজনিত কারণেই অসংখ্য আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হয়েছে।

৩) মধ্য-মহাদেশীয় বলয় :- এই বলয়ের অবস্থান ভূমধ্যসাগরের উভয় পাশে, পূর্ব আফ্রিকায় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। তবে এই বলয়ের বাইরেও বেশ কয়েকটি আগ্নেয়গিরি রয়েছে।

২) মধ্য আটলান্টিক বলয় :- আটলান্টিকের মাঝ বরাবর এই বলয়ের বিস্তার উত্তরে আইসল্যান্ড থেকে দক্ষিণে বুভেট (Bouvet) পর্যন্ত।

🔸আগ্নেয় পর্বত উৎপত্তির কারণ🔸

১) পাতসংস্থান তত্ত্ব : এই তত্ত্ব অনুসারে, দুটি মহাদেশীয় মহাসাগরীয় পাত মুখােমুখি অগ্রসর হলে তাদের মধ্যে প্রবল। সংঘর্ষ ঘটে এবং ভারী নিমজ্জিত পাতটি গলে গিয়ে ম্যাগমা শিলাস্তরের ফাটল পথে ভূপৃষ্ঠে চলে এসে সঞ্চিত হয়ে আগ্নেয় পর্বতের সৃষ্টি করে। উদাহরণ – জাপানের ফুজিয়ামা।

২) হটস্পট ধারণা : দীর্ঘকাল ধরে লাভার সঞ্জয়ের ফলে আগ্নেয় পর্বত সৃষ্টি হওয়ায় একে সঞ্চয়জাত পর্বত বলে। ভূত্বকের গভীরে তেজস্ক্রিয়তাজনিত উত্তাপ বৃদ্ধির ফলে হটস্পট তৈরি হয়। এখান থেকে তাপের ঊর্ধ্বমুখী পরিচলন স্রোতের মাধ্যমে ম্যাগমার উদগিরণ ঘটে এবং তা কালক্রমে সঞ্চিত হয়ে আগ্নেয় পর্বত সৃষ্টি হয়। উদাহরণ হাওয়াই দ্বীপের মৌনালােয়া।
দীর্ঘকাল ধরে লাভার সঞ্জয়ের ফলে আগ্নেয় পর্বত সৃষ্টি হওয়ায় একে সঞ্চয়জাত পর্বত বলে।

৩) ম্যাডােনাল্ডের মত : বিখ্যাত ভূবিজ্ঞানী ম্যাকডােনাল্ডের মতে, প্রবল। ভূ – আলােড়নের ফলে ভূত্বকে ফাটলের মধ্য দিয়ে ভূগর্ভস্থ উত্তপ্ত ম্যাগমা , কাদা, ছাই, গ্যাস, বাষ্প প্রভৃতি প্রবল বেগে বেরিয়ে। এসে ফাটলের চারপাশে সঞ্চিত হয়ে আগ্নেয় পর্বত সৃষ্টি হয়। উদাহরণ ভারতের ব্যারেন।

আরও পড়ুন – কিল্ক করুন

Leave a Comment