গুপ্ত যুগের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য এবং শিল্পকলা

হ্যালো বন্ধুরা, আজকে আমরা গুপ্ত যুগের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য এবং শিল্পকলা এই প্রশ্নের উত্তরটি আজকের এই পোস্টে বিস্তারিত আলোচনা করছি । ইতিহাসের এটি একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং পরীক্ষাতে প্রায়ই প্রশ্নটি এসে থাকে তাই প্রশ্নটি মন দিয়ে পড়ুন এবং বন্ধুদের সাথেও শেয়ার করুন ।

এর আগের পোস্ট এ আমরা দ্বিতীয় নগরায়ন | দ্বিতীয় নগরায়ন বলতে কী বোঝো এই প্রশ্নের উত্তরটি আলোচনা করেছিলাম ।

গুপ্ত যুগের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য এবং শিল্পকলা

গুপ্ত যুগের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য এবং শিল্পকলা

প্রাচীন ভারতীয় শিল্প প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল গুপ্ত যুগের ভাস্কর্য এর মধ্যে ।এযুগের ভাস্কর্যের শিল্প ভাবনার সঙ্গে চিন্তা ও মনোননের এক অভূতপূর্ব মিলন ঘটেছিল । কয়েক শতাব্দীর শিল্প ভাবনা বিবর্তনের পরিণতি ঘটেছিল গুপ্ত যুগে । গুপ্তযুগের ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে মানুষের পার্থিব ও মানবিক সত্ত্বাকে শিকার করা হয়েছিল । এক কথায় অমরাবতীর শিল্প শৈলীকে অতিক্রম করে গুপ্তযুগের ভাস্কর্য এক অতিন্দ্রিয় স্তরে পৌঁছায় ।

গুপ্তযুগের ভাস্কর্যের দুটি প্রধান কেন্দ্র হল মথুরা ও সারনাথ । এছাড়া পূর্ব ভারতে পাটলিপুত্রকে কেন্দ্র করে শিল্প সাধনার প্রচলন ঘটেছিল । এই তিনটি প্রধান কেন্দ্র ছাড়াও মধ্যপ্রদেশ এর উদয়গিরি, এরান ও মান্দাসরে অপ্রধান কিছু শিল্পকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল ।মথুরায় লাল বেলেপাথর এর এবং অনেক সময় ঈষৎ হলুদ চুনাপাথরে বুদ্ধ ও বোধীস্বত্বের মূর্তি নির্মিত হয়েছিল । মথুরা ভাস্কর্য শিল্প সম্পর্কে নিহাররঞ্জন রায়ের বক্তব্য হল মথুরার ভারী ও স্থূল একান্ত ইহাগত এবং সুক্ষানূগতিবিহীন বুদ্ধ বোধিস্বত্ব ক্রমশ গুপ্ত আমলে সুক্ষ মার্জিত তিলব ধ্যানকেন্দ্রিক, যোগগর্ভ বুদ্ধ, বোধিস্বত্ব মূর্তিতে রুপান্তর লাভ করেন । এই রুপান্তরের মধ্যে সমগ্র ভারতীয় বুদ্ধি ও কল্পনার মনন ও সাধনার সুগভীর ইতিহাস রচিত ।

সারনাথের ভাস্কর্য শিল্প আলোচনা প্রসঙ্গে মহারাজ ত্রিকমল নামে জনৈক্য ব্যাক্তির ৬৪ বর্ষে উণকীর্ণ বৌদ্ধ গয়ায় প্রাপ্ত একটি বোধিস্বত্ব মূর্তির কথা স্বাভাবিক ভাবেই আসবে । এটির আনুমানিক সময়কাল খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতক যা গুপ্তযুগের মধ্যেই পড়ে । বস্তুত গুপ্তযুগের মথুরা শিল্পের আদর্শ অনসরণ করে এই মূর্তিটি নির্মিত বুদ্ধ গয়ার এই মূর্তিটির মধ্যে এক আধ্যাত্মিক ভাব প্রতিফলিত হয়েছে ।

ভারতীয় শৈলীতে নির্মিত সারনাথের ভাস্কর্য শিল্প অসাধারণ গুরুত্ব লাভ করেছিল । সারনাথের বুদ্ধ মূর্তিগুলি নির্মিত হয়েছে চুনারের বেলেপাথরে । বুদ্ধ মূর্তি ছাড়াও বুদ্ধ দেবের জীবনে বিভিন্ন ঘটনাও নির্মিত অবস্থায় পাওয়া গেছে । সর্বপ্রথম সারনাথের বুদ্ধ দেবের ধর্মপ্রচার এর বিষয়টি একটি বজ্রাসনে উপকৃষ্ট । এই বুদ্ধ মূর্তিটিতে হাত দুটি ধর্মচক্র প্রবর্তন মুদ্রায় তোলা হয়েছে ।

এই মূর্তিটিকে দেখলে মনে হয় যে অন্তরায় মধ্যে এক সুক্ষ্ম অনুভূতি বিরাজমান । এছাড়াও সারনাথের বুদ্ধের ধ্যানমগ্ন এর মধ্যে আধ্যাত্মিকতার বহিরপ্রকাশ অত্যন্ত স্পষ্ট । বস্তুতপক্ষে সারনাথের পাওয়া বৌদ্ধ মূর্তিগুলি হল গুপ্তযুগের ভাস্কর্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন । ভারতীয় শিল্পের এক স্বতন্ত্র সৃষ্টি হিসেবে সারনাথের মূর্তিগুলিকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে । ভাস্কর্যের স্থাপত্য শৈলীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায় বাংলাতেও । এ প্রসঙ্গে ‘বিহরেইল’ গ্রামে চুনারের বেলেপাথরে নির্মিত খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতকে এক বুদ্ধ মূর্তির কথা বলা হয়েছে । পাটলিপুত্র ও মথুরা কে কেন্দ্র করে বৌদ্ধ মূর্তির শিল্পরীতি গড়ে উঠেছিল । অর্থাৎ মথুরা, সারনাথের ন্যায় পাটলিপুত্র ও ছিল বৌদ্ধ শিল্প কেন্দ্র । পাটলিপুত্রের শিল্পরীতির স্পষ্ট প্রভাব পরিলক্ষিত হয় বিহার এর সুলতানগঞ্জের বৌদ্ধ মূর্তিতে । এছাড়াও নালন্দায় প্রাপ্ত বিশালাকার বৌদ্ধ মূর্তি এবং রাজগিরে পাওয়া মূর্তি গুলিও পাটলিপুত্রের শিল্পের পর্যায়ে পড়ে । পাটলিপুত্রের শিল্পরীতির ওপর মথুরা ও সারনাথ শিল্পের প্রভাবকে একেবারে অস্বীকার করা যাবে না ।

অপরের প্রধান প্রধান শিল্পকেন্দ্রগুলি ছিল প্রধানত বৌদ্ধ শিল্প কেন্দ্র । এগুলি ছাড়াও উদয়গিরি, দেওগড়, এরান, ভেতরগাঁও, প্রভৃতি অঞ্চলে অপ্রধান কিছু শিল্প কেন্দ্র গুপ্ত যুগে গড়ে উঠেছিল । তবে এই কেন্দ্রগুলি ছিল প্রধানত ব্রাহহ্মন্য ধর্মকেন্দ্রিক শিল্প । পূর্ব মালবে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতকে উদয়গিরিতে বিষ্ণুর অবতারের মূর্তি পাওয়া গেছে । এই মূর্তিটিতে অরজকতার বিরুদ্ধে বিষ্ণুদেবতার এক তীব্র শক্তি ফুটে উঠেছে । এছাড়াও অনন্ত শয্যায় শায়িত খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতকে বৌদ্ধ মূর্তি পাওয়া গেছে ।

পরিশেষে বলা যায় যে দীর্ঘকাল ধরে ভারতবর্ষে শিল্পের ক্ষেত্রে যে বিবর্তন ঘটেছিল তার পরিণতি ঘটেছিল গুপ্ত যুগে বিশেষ করে মথুরা ও সারনাথ শিল্পে । এর মধ্যে আবার শিল্প প্রতিভার সার্বাঙ্গিক স্তরে পৌঁছেছিল সারনাথ শিল্প ।

আরও পড়ুন-

জাতীয় কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশন (১৯০৭)

হরপ্পা সভ্যতার সময়কাল নির্ণয় কর

প্রাচীন ভারতের দাসপ্রথা সম্পর্কে আলোচনা কর?

Leave a Comment