গুপ্ত শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করো

হ্যালো বন্ধুরা, আজকে আমরা গুপ্ত শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে আজকের এই পোস্টে বিস্তারিত আলোচনা করছি । ইতিহাসের এই প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং পরীক্ষাতে এই প্রশ্নটি প্রায়ই এসে থাকে তাই উত্তরটি মন দিয়ে পড়ুন এবং বন্ধুদের সাথেও শেয়ার করুন ।

এর আগের পোস্টে আমরা গুপ্তযুগের গিল্ড ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করেছিলাম ।

গুপ্ত শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করো

গুপ্ত শাসন ব্যবস্থা

উত্তর প্রদেশ কে কেন্দ্র করে গুপ্ত সম্রাট উত্তর, মধ্য, পূর্ব ও পশ্চিম ভারতের এক বিশাল এলাকা জুড়ে সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ ঘটিয়েছিলেন । কোন অঞ্চল গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর তা সরাসরি গুপ্ত প্রশাসনিক ব্যাবস্থার আওতায় আসত । বীজিত অঞ্চলগুলিকে সাম্রাজ্যের আওতাধীনে এনে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ছক অনুযায়ী গুপ্ত শাসকরা শাসনকার্য পরিচালনা করতেন । নিম্নলিখিত আলোচনার মাধ্যমে গুপ্ত প্রশাসনিক ব্যাবস্থার ধরণ উপলব্ধি করা যেতে পারে ।

বিভিন্ন শিলালেখ ও সাহিত্যিক উপাদান গুপ্ত প্রশাসনিক ব্যাবস্থার জন্য তথ্য সরবরাহ করে । গুপ্ত লেখগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সমুদ্রগুপ্তের এরান লেখ, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের উদয়গিরি লেখ, দামোদরপুর তাম্রশাসন, স্কন্দগুপ্তের জুনাগড় লেখ প্রভৃতি । সাহিত্য উপাদানের মধ্যে চিনা পর্যটক ফা হিয়েন এর বিবরণ উল্লেখযোগ্য । তাছাড়া মনুস্মৃতি, নারদস্মৃতি, কামন্ডক এর নিতীসার এক্ষেত্রে ব্যাবহার হয় ।

গুপ্ত শাসনব্যাবস্থা কে দুটি ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা যেতে পারে । কেন্দ্রীয় ও প্রশাসনিক ।

মৌর্য ও সাতবাহন আমলের ন্যায় গুপ্ত যুগেও শাসনব্যাবস্থার শীর্ষে বিরাজ করতেন সম্রাট । গুপ্ত সম্রাটগণ কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন উপাধি যেমন- পরম রাজাধিরাজ প্রভৃতি থেকে গুপ্ত সম্রাটদের সীমাহীন কর্তৃত্বের আভাস পাওয়া যায় । তাছাড়া গুপ্ত সম্রাটগণ ঈশ্বরের সমকক্ষ হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করার মানসিকতা পোষণ করতেন । রাজা ছিলেন সামরিক, বিচার, শাসনব্যাবস্থার সর্বময় কর্তা । যুদ্ধক্ষেত্রে রাজা নিজে উপস্থিত থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন ।

গুপ্তযুগে আমলাতান্ত্রিক উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের দ্বারা পরিচালিত হতেন । যথা- মহাবলিধিকৃত এর অর্থ সেনাবাহিনীর প্রধান । এছাড়া যুদ্ধ ও শান্তি বিভাগের মন্ত্রী ছিলেন উচ্চপদস্থ কর্মচারী । গুপ্ত প্রশাসনিক ব্যাবস্থায় অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের মধ্যে কুমারামাত্য উল্ল্যেখযোগ্য । বিভিন্ন ধরণের কাজের সঙ্গে এরা যুক্ত থাকতেন । এছাড়া উচ্চপদস্থ কর্মচারী এই কুমারমাত্য রা গুপ্ত শাসনব্যাবস্থায় কেন্দ্র ও প্রাদেশিক স্তরের মধ্যে সংযোগস্থাপন করতেন । গুপ্ত কেন্দ্রীয় শাসনব্যাবস্থার একই ব্যাক্তি একাধিক পদে অধিষ্ঠিত হতে পারত । সমুদ্রগুপ্তের এলাহবাদ প্রশস্থির রচয়িতা হরিসেন কুমারমাত্য ও মহাদন্ডনায়ক পদ অবলম্বন করেছিলেন । এছাড়া গুপ্ত শাসনব্যাবস্থায় আমলাতান্ত্রিক পদগুলি বংশ পরম্পরায় উত্তরাধিকারী গণ ভোগ করত ।

সাম্রাজ্যবাদী গুপ্তশাসকরা শাসনক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন । প্রাদেশিক শাসনব্যাবস্থায় শাসন কাজের সুবিধার জন্য গুপ্ত সাম্রাজ্যকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা হয় । যেমন- দেশ, ভুক্তি, বিষয় প্রভৃতি । দেশ শাসন করত গোপ্ত্রী নামক ব্যাক্তিরা । এটি ছিল গুপ্ত শাসনব্যাবস্থার বৃহত্তর একক । ভুক্তিরা তিরভুক্তি, শ্রাবতী ভুক্তি প্রভৃতি ভাগে বিভক্ত এবং যার শাসনকর্তাকে বলা হত উপরীক । এছাড়া বিষয় ছিল আরও এক প্রশাসনিক একক । বিষয় বা জেলা শাসনের দায়িত্ব ছিল বিষয়পতির উপর

এছাড়া পুস্তপাল নামে আর এক শ্রেণীর কর্মচারীর উল্লেখ পাওয়া যায় যারা বিষয় বা প্রাদেশিক গুপ্তযুগের প্রাদেশিক শাসনব্যাবস্থার সর্বনিম্ন একক ছিল গ্রাম । এটি নিম্নতর প্রশাসনিক একক হলেও এর যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল । গ্রাম শাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিল গ্রামীক, ভোজক প্রভৃতি ব্যাক্তি ।

গুপ্তযুগে রাজা বিচার ব্যাবস্থার সর্বোচ্চ পদে ছিলেন । তিনি স্বয়ং জেলা বা প্রাদেশিক শহরগুলিতে রাজকার্য পরিচালনা করতেন । জেলা ও প্রাদেশিক শহরগুলিতে আদালত ছিল । অনেক ক্ষেত্রে গিল্ড বা নিগম গুলিও বিচারকার্য পরিচালনা করতেন । ফা-হিয়েন এর বিবরণ থেকে জানা যায় যে গুপ্ত যুগে দ্বন্দ্ব বিধি কঠোর ছিল না । বিচার ব্যাবস্থা তথা শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার প্রচেষ্টা গুপ্তযুগে সফল হয়েছিল ।

রাজস্ব ব্যাবস্থার একটি অঙ্গে যার কর্তৃত্ব ছিল রাজা এর প্রধান উৎস ছিল ‘ভাগ’ অর্থাৎ রাজার প্রাপ্য জমির উৎপন্ন ফসলের একাংশ, সাধারণত উৎপন্ন শস্যের ১/৬ অংশ রাজা কর হিসেবে পেত । এছাড়া বাণিজ্যকর, দুর্গকর প্রভৃতি এবং যুদ্ধ ও বৈদেশিক আক্রমণের সময় আদায় করা হত ‘মল্লকর’ ।

গুপ্ত শাসনব্যাবস্থার প্রকৃতি আলোচনা করলে দেখা যাবে যে যদিও গুপ্ত শাসকরা শাসনব্যাবস্থার শীর্ষে ছিলেন তবুও শাসন ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতা ছিল সীমিত । স্মৃতিশাস্ত্র বিধিবিধান অনুযায়ী রাজাকে চলতে হত ।

সবশেষে বলা যায় যে গুপ্ত শাসনব্যাবস্থায় যথেষ্ট প্রশংসার দাবী রাখে । জনগণের মঙ্গলসাধন করায় ছিল গুপ্তশাসন ব্যাবস্থার প্রধান অঙ্গ ।

আরও পড়ুন-

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর?

সঙ্গম সাহিত্য সম্পর্কে একটি টীকা লেখ।

গিয়াসুদ্দিন বলবনের নরপতিত্বের আদর্শ ব্যাখা কর

Leave a Comment