ঠান্ডা যুদ্ধের কারণ ও পটভূমি আলোচনা কর

আজকে ঠান্ডা যুদ্ধের কারণ কি তা নিয়ে নীচে আলোচনা করা হল –

পটভূমি – আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হ্যারি এস ট্রুম্যান ১৯৪৭ সালে যে মতবাদ ঘোষণা করেছিলেন তা ‘ট্রুম্যান মতাদর্শ’ বলে পরিচিত । ১৯৪৭ সাল নাগাদ ট্রুম্যান ডকট্রিন ঘোষণার সময় থেকেই ঠাণ্ডা যুদ্ধের প্রকৃতি সূচনা হয়েছিল । সুতরাং ট্রুম্যান ডকট্রিন ঠাণ্ডা লড়াই- এর পটভূমি হিসেবে কাজ করেছিল, ঠাণ্ডা যুদ্ধের পটভূমি জদিও অনেক আগেই দেখা দিয়েছিল । ১৯১৭ সালে রাশিয়াতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব অনুষ্ঠিত হয়েছিল । ফলে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা প্রকাশ করে । বিশ্বে আধিপত্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সোভিয়েত রাশিয়ার থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে যেতে চাইছিল । তাই রাশিয়ার কোনোরকম ইতিবাচক পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দসই ছিল না ।

ঠান্ডা যুদ্ধের কারণ

ক) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতিতে দ্বি-মেরুকরণ শুরু হলে, তার ফলশ্রুতিতে আদর্শগত সংঘাতের সূত্রপাত হয় । দুটি পরস্পর বিরোধী মতবাদ ও জীবনাদর্শ একে অপরের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামে লিপ্ত হয়, যার অনিবার্য পরিণাম হল এক ধরনের অস্ত্রবিহীন মানসিক তথা স্নায়ুর লড়াই, পারস্পরিক চাপ সৃষ্টির কৌশল । এ থেকেই ঠান্ডা যুদ্ধের সূত্রপাত ।

খ ) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে শক্তির ভারসাম্য ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি থেকে সরে গিয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়ার অনুকূলে চলে যায় । দুটি বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্রের আবির্ভাবে দুটি নতুন শক্তিজোট তৈরি হয়, যার এক দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য দিকে সোভিয়েত রাশিয়া অবস্থান করে । ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলির কিছু কিছু দেশ আমেরিকা ও কিছু কিছু দেশ রাশিয়ার পক্ষ অবলম্বন করলে পৃথিবী দুটি শিবিরে ভাগ হয়ে যায় । একটি আমেরিকা ও তার সহযোগী দেশ, অন্যটি রাশিয়া ও তার মিত্র দেশ । এর মধ্যে এশিয়া, আফ্রিকার কিছু দেশ নিরপেক্ষ অবস্থান নেয় এবং জোটনিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করে । ভারতবর্ষ তার অন্যতম ।

গ) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৩৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করেছিল । সোভিয়েত ইউনিয়ন নাৎসী জার্মানির সঙ্গে ১৯৩৯ সালে Non Aggression pact বা অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল । জার্মানির সঙ্গে রাশিয়ার সহযোগিতার ফলে পূর্ব পোল্যান্ড এর বেশ কিছু অঞ্চল ও ফিনল্যান্ড রাশিয়া অধিকার করেছিল । ট্রুম্যান ডকট্রিন এবং মার্শাল প্ল্যান প্রভৃতির মধ্যে দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সোভিয়েত বিরোধী মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ।

ঘ) ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ ই মার্চ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল আমেরিকার ফুলটন শহরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এইচ. ট্রুম্যানের সামনে এক ভাষণে সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিরামহীন রাজনৈতিক সংগ্রামের সংকল্প ঘোষণা করেন । চার্চিল তার ভাষণে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদীদের হাত শক্ত করার জন্য অস্ত্রসজ্জা, সমাজতান্ত্রিক আগ্রাসন ঠেকাতে রাশিয়ায় সামরিক ঘাঁটি স্থাপন, সামরিক জোট গঠন ইত্যাদি পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেন । এরই পরিণতিতে বিশ্বব্যাপী পশ্চিমি প্রাধান্য বজায় রাখতে শক্তির আস্ফালনের জন্য আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তিজোট, যেমন ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা এপ্রিল ন্যাটো , ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে সিয়াটো , ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে সেন্টো ইত্যাদি সামরিক শক্তিজোট গঠন করে ।

ঙ) অন্যদিকে রাশিয়ার নেতৃত্বে এশিয়া, আফ্রিকা এমনকি ইউরোপের কিছু কিছু দেশে সমাজতান্ত্রিক ভাবনা জনপ্রিয়তা লাভ করে । পূর্ব জার্মানি, রুমানিয়া, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, চেকোশ্লোভাকিয়া, উত্তর কোরিয়া ইত্যাদি দেশে সাম্যবাদী আন্দোলন জয়যুক্ত হয় ও গণতান্ত্রিক সরকারের জায়গায় সমাজতান্ত্রিক বা কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হয় । ভারত সহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে কমিউনিস্ট ধীরে ধীরে শক্তিসঞ্চয় করতে থাকে । একই সঙ্গে কিছু কিছু দেশে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে থাকে ।

চ) দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের জন্য দায়ী করে জার্মানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত হয় ইয়াল্টা সম্মেলনে । কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আমেরিকা ও ইংল্যান্ড ক্ষতিপূরণ আদায়ে অনীহা দেখায় । রাশিয়ার ধারণা হয় জার্মানিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর জন্যই ক্ষতিপূরণ আদায় করা হচ্ছে না ।

ডি এফ ফ্লেমিং তাঁর “The Cold War and Its Origin ” গ্রন্থে চার্চিলের ফুলটন বক্তৃতায় ঠাণ্ডা লড়াই এর পটভূমিকা হিসাবে কাজ করেছিল বলে মনে করেন । চার্চিলের বক্তৃতাই সমলোচনা করে তিনি বলেন, ফুলটন বক্তৃতাই দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে উত্তেজনার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল বলেই ‘Cold War’ এর উদ্ভব হয়েছিল ।

আরও পড়ুন – বাবর কি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন

সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশুনা করার জন্য আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত হন

Leave a Comment