ডারউইনের বিবর্তন মতবাদ

আজকে আমরা ডারউইনের বিবর্তন মতবাদ অথবা বিবর্তন সম্পর্কিত ডারউইনের মতবাদ সম্বন্ধে আলোচনা করছি

ডারউইনের বিবর্তন মতবাদ

ডারউইন 1859 খ্রিস্টাব্দে ” The Origin of Species by means of Natural Selection ” গ্রন্থে জৈব অভিব্যাক্তি বা বিবর্তনের সপক্ষে যে মতবাদ প্রকাশ করেন , তাকেই ডারউইনবাদ বা ডারউইনিজম বলে । ডারউইনের মতবাদের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়গুলি হল –

১) অত্যাধিক হারে বংশবৃদ্ধি – ডারউইনের মতে জীবের সহজাত বৈশিষ্ট্য হল অত্যাধিক হারে বংশবৃদ্ধি করা । ডারউইন লক্ষ্য করেন জীবের সংখ্যা বৃদ্ধি জ্যামিতিক ও গাণিতিক হারে ঘটে থাকে । উদাহরণ হিসেবে বলা যায় – একটি স্ত্রী স্যামন মাছ একটি প্রজনন ঋতুতে প্রায় তিন কোটি ডিম পাড়ে ।

২) খাদ্য ও বাসস্থান সীমিত – পৃথিবীর আয়তন যেহেতু নির্দিষ্ট সেহেতু জীবের বসবাসের স্থান এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও সীমিত ।

৩) জীবনসংগ্রাম – একদিকে অত্যাধিক জন্মের বা বংশবৃদ্ধির হার, অন্যদিকে খাদ্য ও বাসস্থান সীমিত হওয়ায় প্রতি মুহূর্তে জীবকে জীবনসংগ্রামে উপনীত হতে হয় । এই সংগ্রাম মূলত তিন প্রকার –

ক) অন্তঃপ্রজাতি সংগ্রাম – খাদ্য, বাসস্থান প্রভৃতির জন্য একই প্রজাতির জীবগোষ্টীর মধ্যে সংগ্রাম ।

খ) আন্তঃপ্রজাতি সংগ্রাম – খাদ্য, বাসস্থান প্রভৃতির জন্য বিভিন্ন প্রজাতির জীবগোষ্টীর মধ্যে সংগ্রাম ।

গ) পরিবেশ গত সংগ্রাম – খাদ্য, বাসস্থান প্রভৃতির জন্য বন্যা, খরা, ভূমিকম্প প্রভৃতি প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ।

৪) প্রকরণ বা ভ্যারিয়েশন – ডারউইনের মতে, পৃথিবীর যে-কোনো দুটি জীব কখনোই অবিকল একই রকমের হতে পারে না । প্রত্যেক এর মধ্যে কিছু-না-কিছু পার্থক্য অবশ্যই থাকবে । এই পার্থক্যকেই ভ্যারিয়েসেন বা প্রকরণ বলে । অনুকূল পরিবৃত্তি জীবনসংগ্রামে জীবকে সাহায্য করে ।

৫) যোগ্যতমের উদবর্তন ও প্রাকৃতিক নির্বাচন – ডারউইনের মতে, অনুকূল প্রকরণগুলি জীবকে অভিযোজনে সহয়তা করে কিন্তু প্রতিকূল প্রকরণগুলি অভিযোজনে সহয়তা করতে পারে না । ফলে প্রতিকূল প্রকরণ যুক্ত জীব ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হয় এবং অনুকূল প্রকরণ যুক্ত জীব পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য বিবেচিত হয় । একে যোগ্যতমের উদবর্তন বলে ।

স্পেনসার সর্বপ্রথম যোগ্যতমের উদবর্তন কথাটি প্রকাশ করেন ।

৬) নতুন প্রজাতির উৎপত্তি – একটি বিশেষ জীবগোষ্টীর মধ্যে অনুকূল প্রকরণগুলি পুঞ্জিভূত হওয়ায় পূর্বপুরুষদের মধ্যে অনেক বেশী বৈসাদৃশ্য দেখা যায় । এর ফলে কালক্রমে নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয় ।

৭) প্রাকৃতিক নির্বাচন – যে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় অনুকূল ভেদ সমন্বিত জীবেরা অন্যান্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, তাকে প্রাকৃতিক নির্বাচন বলে । অনুকূল ভেদ সমন্বিত জীবেরা প্রকৃতির দ্বারা নির্বাচিত হলে বেশি সংখ্যায় বেঁচে থাকে এবং অত্যাধিক হারে বংশবিস্তার করে । প্রাকৃতিক নির্বাচন এক্ষেত্রে চালুনির মতো কাজ করে এবং সবচেয়ে উন্নত ও যোগ্যতম বংশধরকে ধরে রাখে । অপরপক্ষে, প্রতিকূল ভেদ সমন্বিত জীবেরা প্রকৃতির দ্বারা নির্বাচিত হয় না বলে পরাজিত সৈনিকের মতো ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হয়ে যায় ।

Read More – কোষ পর্দা ও কোষ প্রাচীরের পার্থক্য। কোষ পর্দা কাকে বলে

৮) প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রাম – বন্যা, খরা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, প্রচন্ড বালিঝড়, ভূমিকম্প, অগ্ন্যুত্পাত প্রভৃতি প্রতিকূল পরিবেশ জীবের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে । সুতরাং জীবকে তার অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য প্রতিনিয়ত এইসব প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয় । উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কোয়েল পাখি প্রচন্ড ঠান্ডা ও তুষারপাতের ফলেই লুপ্ত হয়েছে ।

৯) বিষমপ্রজাতির সঙ্গে সংগ্রাম – যে-কোনও দুই বা ততোধিক প্রজাতির মধ্যে বাঁচার জন্য যে প্রতিযোগিতা ঘটে তাকে আন্তঃপ্রজাতির সংগ্রাম বলে । উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, ব্যাঙ একদিকে কীট-পতঙ্গ ভক্ষণ করে, অন্যদিকে তেমনি ব্যাঙেরা সাপ কর্তৃক ভক্ষিত হয় । আবার, ময়ুর কর্তৃক ব্যাঙ ও সাপ উভয়েই ভক্ষিত হয় —এইভাবে নিতান্ত জৈবিক কারণেই বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে খাদ্যখাদক সম্পর্কযুক্ত একটি নিষ্ঠুর জীবনসংগ্রাম গড়ে ওঠে ।

Read More : গ্রন্থি কন্দ কাকে বলে ও স্ফীত কন্দ কাকে বলে

সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশুনা করার জন্য আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত হন

Leave a Comment