নৌ বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর (১৯৪৬)

হ্যালো বন্ধুরা, আজকে আমরা নৌ বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল এই প্রশ্নের উত্তরটি আজকের এই পোস্টে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করছি । ইতিহাসের এই প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং মাধ্যমিক পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি বারবার ই আসে তাই প্রশ্নটি মন দিয়ে পড়ুন এবং বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন ।

এর আগের পোস্ট আমরা গান্ধীজির ডান্ডি অভিযান এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও এই প্রশ্নের উত্তরটি আলোচনা করেছিলাম ।

ভারতীয় মুক্তিযুদ্ধ আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল ভারতীয় নৌবিদ্রোহ । ঐতিহাসিক রজনী পামদত্তের মতে, “নৌবিদ্রোহ ভারতের ইতিহাসে এক নবযুগের সূচনা করে” ।

নৌ বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল

নৌ বিদ্রোহের কারণ

ভারতের ইতিহাসের নৌবিদ্রোহের কারণ গুলিকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ এই দুই ভাগে ভাগ করা হয় । নৌবিদ্রোহের কারণগুলি নীচে দেওয়া হল-

১) বর্ণবৈষম্য নীতি- ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রতি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বর্ণবৈষম্য নীতি হল নৌবিদ্রোহের অন্যতম কারণ । ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৬ সালে ভারতীয় নৌ বাহিনীর ওপর এক নিয়ে আসেন এই নীতি অনুসারে নৌ বাহিনীর উচ্চপদে একমাত্র শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশরাই থাকতে পারবে । ভারতীয় নৌ সেনাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তারা উচ্চপদ থেকে বঞ্চিত করা হয় । এই আইন এর ফলে ভারতীয় নৌবাহিনী ব্রিটিশদের এই আইনে অত্যন্ত খুদ্ধ হন ।

২) বৈষম্যমূলক আচরন- ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রতি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বৈষম্যমূলক আচরণ নৌবিদ্রোহের অন্যতম কারণ । নৌবাহিনী তে ভারতীয় সেনাদের অত্যন্ত্য নিম্নমানের ও পুরনো অস্ত্র দেওয়া হত যার ফলে যুদ্ধের সময় বেশী প্রাণ যেত ভারতীয় নৌসেনাদের । ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রতি এই বৈষম্যমূলক আচরণ ভারতীয় নৌসেনাদের আরও খুদ্ধ করে ।

৩) নৌসেনাদের ছাঁটাই- প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় নৌসেনাদের ব্যাপক ভাবে ব্যাবহার করা হয় । বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় সেনা অত্যন্ত্য বীরত্বের সাথে লড়াই করলে যুদ্ধের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলেই ভারতীয় নৌসেনাদের ছাঁটাই করা শুরু করে । নৌসেনাদের চাকরী থেকে বের করে দেওয়ায় নৌসেনারা আর্থিক সংকটে পড়ে যার ফলে সেনারা বিদ্রোহের পরিকল্পনা শুরু করে ।

৪) সেনাদের প্রতি খারাপ ব্যাবহার-

ব্রিটিশ সেনাবাহিনীরা ভারতীয় সেনাবাহিনীদের সাথে অশ্লীন ব্যাবহার করত এবং গালিগালাজ ও করত । ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর এই খারাপ ব্যাবহার নৌবিদ্রোহের অন্যতম কারণ । এর ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনী রাও বুঝতে পেরে যায় যে তাদের সেনাবাহিনী তে কোন মূল্যই দেওয়া হচ্ছে না ।

৫) পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত- সরকার ভারতীয় সেনাবাহিনী তে থাকা নিম্ন জাতির সেনাদের পদোন্নতি থেকে বিরত রাখত । অর্থাৎ নিম্নজাতির মানুষদের সেনাবাহিনী তে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হত ।

এছাড়া, নৌসেনাদের দুই ভাগে অর্থাৎ ‘Indian other rank’ ও ‘British other rank’ তে ভাগ করা হয় ।

৬) নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহ- ভারতীয় নৌসেনাবাহিনী তে থাকা মাঝি, মোল্লাদের অত্যন্ত নিম্নমান্নের খাদ্য সরবরাহ করা হত । ভারতীয় নৌবাহিনীদের খাবার এর গুণগত মান অত্যন্ত নিম্ন মানের ছিল ।

এছাড়া, সমযোগ্যতা সম্পন্ন ভারতীয় নৌসেনাবাহিনীকে ব্রিটিশ নৌসেনাবাহিনী অপেক্ষা অনেক কম বেতন দেওয়া হত । এছাড়া সৈনিকদের কার্যকালের শেষে কোন ভাতাও দেওয়া হত না । ভারতীয় নৌসেনাবাহিনীর প্রতি এই বেআইনি বেতন বৈষম্য নীতি ভারতীয় সেনাবাহিনীদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করে ।

ভারতীয় নৌবিদ্রোহের সূচনা

১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে বোম্বাই বন্দরে ‘তলোয়ার’ নামক জাহাজে রেডিও অপারেটর বলাই দত্তের পদচুত্যের প্রতিবাদে ভারতীয় নৌসেনাবাহিনীর প্রধান এম এস খানের নেতৃত্বে ১৫০০ নাবিক ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই ফেব্রুয়ারী বিদ্রোহ ঘোষণা করে ।

বিদ্রোহের প্রসার- ‘তলোয়ার’ নামক জাহাজে বিদ্রোহ শুরু করার পর নৌসেনারা আরও ২২ টি জাহাজে বিদ্রোহ শুরু করে যার ফলে কলকাতা, মাদ্রাজ, কারাচি, জামনগর, চট্টগ্রাম, বিশাখাপত্তনম প্রভৃতি স্থানে বিদ্রোহ ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে । ব্রিটিশ জাহাজে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় ।

নৌসেনাদের দাবী

কমিটির প্রেসিডেন্ট এম এস খান ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মদন সিংহ বেশ কিছু দাবী পেশ করেন এবং সেই দাবী গুলি ছিল-

১) উন্নত মানের খাবারের ব্যাবস্থা করতে হবে ।

২) বন্দি সেনাদের মুক্তি করতে হবে ।

৩) নৌসেনাদের কার্যকালের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাদের পুনর্বাসনের ব্যাবস্থা করতে হবে ।

৪) ব্রিটিশ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীকে একই নজরে দেখতে হবে ।

৫) ইন্দোনেশিয়া তে থাকা ভারতীয় নৌসেনাদের ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে ।

বিদ্রোহের অবসান

বিদ্রোহ দমন করতে ব্রিটিশ নৌসেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের সঙ্গে বিদ্রোহ শুরু করে বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে না এলে নৌ সেনার প্রধান অ্যাডমিরাল গডফ্রের নির্দেশে বিমান থেকে বিদ্রোহীদের ওপর বোমা বিস্ফোরণ করা হয় । শেষ পর্যন্ত সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এর নির্দেশে বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে আসে ও বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করে ।

নৌবিদ্রোহের গুরুত্ব

১) নৌবিদ্রোহের ফলে হিন্দু ও মুসলিম দের এক ভালো সম্পর্ক স্থাপিত হয় । আন্দোলনে হিন্দু ও মুসলিম উভয় জাতি এই বিদ্রোহে সমান ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল ।

২) এছাড়া ভারতীয়দের এই আন্দোলনের পর ব্রিটিশ ভীতির অবসান ঘটে । এই বিদ্রোহের পর ভারতীয় নৌসেনাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছিল ।

৩) নৌ বিদ্রোহের জন্যই ব্রিটিশরা ভারতে ক্যাবিনেট মিশন বা মন্ত্রী মিশন পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল ।

মার্কসবাদী ঐতিহাসিক রজনী পামদত্তের মতে, “নৌ নাবিকদের অভ্যুত্থান, সাধারণ মানুষদের সমর্থন ভারতে নবযুগের সংকেত দিয়েছিল” ।

আরও পড়ুন-

বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল আলোচনা কর

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কৃতিত্ব আলোচনা করো

খানুয়ার যুদ্ধ কবে হয়, গুরুত্ব ও ফলাফল

Leave a Comment