বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল আলোচনা কর

আজকে আমরা বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল আলোচনা করবো । আশা করি এই পোস্ট টি তোমাদের অনেক সাহায্য করবে ।

বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল আলোচনা কর

বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি

পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত তৎকালীন বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজ অনুসন্ধানী মন ও যুক্তিতর্কের দ্বারা সবকিছুর মূল্যায়ন শুরু করে। এই সময় চিরাচরিত শাস্ত্রের নতুন ব্যাখ্যা, নীতিশাস্ত্রের ও ধর্মশাস্ত্রের নতুন মূল্যায়ন শুরু হয়। শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, সমাজ, সমস্ত ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় জাগরণ শুরু হয়, যা এক কথায় নবজাগরণ নামে পরিচিত।

ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার তার ‘বাংলার ইতিহাস’ গ্রন্থে উনিশ শতকের বাংলাকে নবজাগরণের পীঠস্থান’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, “কনস্টান্টিনোপলের পতনের পর ইউরোপে যে নবজাগরণ দেখা যায়, উনবিংশ শতকে বাংলার নবজাগরণ ছিল তার থেকেও ব্যাপক, গভীর এবং বৈপ্লবিক। অধ্যাপক সুশোভন সরকার বলেছেন যে, “বাংলাদেশেই সর্বপ্রথম ব্রিটিশ শাসনে বুর্জোয়া অর্থনীতি ও আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব অনুভূত হয়। তার ফলে যে সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটে তাকে সাধারণভাবে নবজাগরণ বলা হয়ে থাকে”।

Read More – পঞ্চশীল নীতি বলতে কি বোঝ ? এর প্রবক্তা কে ?

নবজাগরণ বলতে শুধু প্রাচীন দেশীয় ও ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নতুন মূল্যায়ন প্রচেষ্টাকে বােঝায় না। এই সময় ইংরেজি শিক্ষার ও ইউরােপীয় সংস্কৃতির ছোঁয়ায় বাঙালি আত্মসচেতন হয়ে ওঠে। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি পাশ্চাত্যের সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি প্রভৃতি বিষয়ে সম্যক ধারণা লাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। বাঙালি নিজের ধর্মীয় এবং সামাজিক ত্রুটিবিচ্যুতিগুলি এবং সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনের চরিত্র সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠে। এই সচেতনতাই হল নবজাগরণের আসল ভিত্তি। নবজাগরণের মতাদর্শগত ভিত্তি কখনই ধর্মনিরপেক্ষ বা অসাম্প্রদায়িক ছিল একথা বলা যায় না। তাই অধ্যাপক সুমিত সরকার লিখেছেন—”মুসলিম স্বৈরাচারী শাসনের সহাবস্থান সংক্রান্ত ধারণা থেকেই বুদ্ধিজীবীরা একটি বিদেশি শাসন গ্রহণ করার সুবিধাজনক যৌক্তিকতা খুঁজে পেয়েছিলেন।”

সমালােচকদের ধারণায় উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণ ছিল এলিটিস্ট (Elitist) আন্দোলন। সমাজের মুষ্টিমেয় উচ্চবিত্ত ও উচ্চশিক্ষিত লােকেদের মধ্যেই এই নবজাগরণ সীমাবদ্ধ ছিল। উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণের প্রভাব সমাজের সকল শ্রেণির ওপর পড়েনি। তা ছাড়া এই নবজাগরণ মুসলিম সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়। কারণ মুসলিম সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে সেই সময় কোনাে সংস্কার প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। তা ছাড়া হিন্দ সমাজকেন্দ্রিক সংস্কার প্রচেষ্টা গৃহীত হলেও দেখা যায় যে, হিন্দুসমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ বা কৃষক সমাজের উন্নতির জন্য কোনাে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জওহরলাল নেহরু স্পষ্টভাবে বলেছেন ঔপনিবেশিক শাসনের জ্ঞানদীপ্তি শুধুমাত্র উচ্চবর্ণের বাঙালি হিন্দুদের ওপরই প্রতিফলিত হয়েছিল।

বাংলায় নবজাগরণের মৌলিকত্বের অভাব ছিল। একদিকে বেদ উপনিষদের প্রভাব, অপরদিকে পাশ্চাত্য উদারপন্থা ও হিতবাদের অনুপ্রেরণা। মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালির মতাদর্শ এক মিশ্র চিন্তাধারার জন্ম দেয়। এর কুপ্রভাব হিসেবে তারা ইংরেজি গানের সুরের ঢঙে হিন্দুস্থানি গানের চর্চা করতেন এবং ইংরেজ কায়দায় খানাপিনা করতেন ও বিলাস বৈভবে জাবন কাটাতেন। এদের অনেকেই দেশের ঐতিহ্যমণ্ডিত শিল্পের প্রতি শ্রদ্ধা না দেখালেও ইল্যান্ড থেকে আমদানি করা বিলাসপণ্য ঘরে সাজিয়ে রেখে গর্ব অনুভব করতেন। তাই এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক অমলেশ ত্রিপাঠী বলেছেন- “প্রাচীন ইটালির দ্বিমুখবিশিষ্ট দেবতা জ্যানাসের মতাে তারা একবার সামনের দিকে আধুনিক পাশ্চাত্যের প্রতি তাকিয়েছিল। আর একবার পেছনদিকে প্রাচীন ভারতের প্রতি তাকিয়েছিল। ঘড়ির পেন্ডুলামের মতাে তারা একবার পাশ্চাত্যকরণের দিকে এক একবার ঐতিহ্যগত আদর্শের দিকে এবং এই দুই-এর মধ্যবর্তী স্তরে বিচরণ করেছিল।”

Read More : খানুয়ার যুদ্ধ কবে হয়, গুরুত্ব ও ফলাফল

উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ ছিল মূলত শহরকেন্দ্রিক। এই নবজাগরণের প্রাণকেন্দ্র ছিল কলকাতা। কলকাতার বাইরে অন্যান্য জায়গায় এই নবজাগরণ ছড়িয়ে পড়েনি। তাই গ্রামবাংলার গরিষ্ঠ অংশ এই নবজাগরণের ছোঁয়া পায়নি। বলা যায়, গ্রামের কৃষক ও দরিদ্র শ্রেণির সঙ্গে এই নবজাগরণের কোনাে সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।

বাংলার নবজাগরণের চরিত্র বিচারে কয়েকটি ভাবধারার পরিচয় পাওয়া যায়। এগুলি হল উদারপন্থী ভাবধারা, প্রাচ্যের পুনরুজ্জীবনবাদী বা ঐতিহ্যবাদী ভাবধারা এবং সমন্বয়বাদী ভাবধারা। পাশ্চাত্যের উদারপন্থী ভাবধারার প্রবাবে সমাজসংস্কার, ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, নারীমুক্তি আন্দোলন প্রভৃতি শুরু হয়। যুক্তির আলােকে প্রচলিত প্রথা এবং আচারবিধিগুলি যাচাই করে নেওয়ার রীতি চালু হয়। দ্বিতীয় ধারা অর্থাৎ প্রাচ্যের পুনরুজ্জীবনবাদ বা ঐতিহ্যবাদী ভাবধারা অনুযায়ী প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ লক্ষ করা যায়। তৃতীয় অর্থাৎ সম্বন্বয়বাদী ভাবধারা অনুযায়ী প্রাচীন যুগের যা কিছু শ্রেষ্ঠ তার সঙ্গে পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞানের যা কিছু শ্রেষ্ঠ উভয়ের সমন্বয়ের উদ্যোগ শুরু হয়।

বাংলার নবজাগরণের বৈশিষ্ট্যগুলি কী ছিল ?

উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের বৈশিষ্ট্য – ঊনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা । এর গুরুত্ব বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে অপরিসীম । নবজাগরণের প্রধান কথা হল মধ্যযুগীয় জীবনধারার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, আধুনিক জীবনধারার উদ্বোধন, ধরমনিরপেক্ষ মনোভাব নির্ভর আধুনিক জীবনধারার অভিব্যাক্তি হল নবজাগরণের প্রধান বৈশিষ্ট্য । এর অন্যান্য বৈশিষ্ট্য গুলি হল – ১) সামন্তত্রান্তিক অধিকারের বদলে ব্যাক্তিগত অধিকারের উপর গুরুত্ব আরোপ করা । ২) বংশ কৌলিন্য এর বদলে গুন কৌলিন্য এর স্বীকৃতি, মানুষে মানুষে সমানিধকার ও সুখভোগের ওপর গুরুত্ব আরোপ ইত্যাদি ।

উনিশ শতকের প্রথম দিকে হিন্দুকলেজ প্রতিষ্ঠাকে এদিক থেকে দেখলে ভারতের ইতিহাসে একটি দিক চিণহ বলা যায় । হিন্দু পেট্রিয়ট, বঙ্গদুত, সোমপ্রকাশ, তত্ববোধিনি প্রভৃতির পাতায় বুদ্ধিজীবীর কণ্ঠস্বর প্রথম ধ্বনিত হয় । এই আন্দলন ক্রমেই শক্তিশালী হতে থাকে ।

প্রথম পরবের বাংলার জাগরনের প্রাণপুরুষ হলেন রাজা রাম মোহন রায় ও ইয়ংবেঙ্গল দলের নেতৃবৃন্দ ।রাম মোহন আধুনিক চিন্তাধারার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন, তখনকার দিনের বিচারে তা ছিল অপরিকল্পনিয় ।

দ্বিতীয় পর্বে বাংলার জাগরণে নতুন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় । ইংরাজি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সংখ্যা এ সময় বৃদ্ধি পায় । সমাজে তাদের প্রবাভ ও দেখা যায় কিন্তু তারা উপযুক্ত চাকরী থেকে বঞ্চিত হয় ।

Read More : তৃতীয় বিশ্ব বলতে কী বােঝায় ?

বাংলার নবজাগরণের গুরুত্ব

বাংলার নবজাগরণের গুরুত্ব ছিল অসীম । নানা দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও উনিশ শতকে নবজাগরণের ফলে ভারতীয়রা পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ পায়। এছাড়াও বাংলার সমাজ ধর্ম ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে এই নবজাগরণ কিছুটা পরিবর্তন এনেছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই।জনৈক জার্মান সমাজতত্ত্ববিদের মতে, ভারতে নবজাগরণের মাধ্যমে মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগের সূচনা ঘটেছিল।

বাংলার নবজাগরণের ফলাফল

বাংলায় নবজাগরণের ফলে ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপ আরও তীব্র হয়ে ওঠে । বাংলার নবজাগরণের পর-

  • বাংলায় সতীদাহ প্রথা প্রচলন বন্ধ হয়ে যায়।
  • বাংলায় প্রথম হিন্দু বিধবা বিবাহ প্রবির্তিত হয়।
  • শিক্ষা বিস্তারে নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • হিন্দু কলেজ সব ধর্মের ছাত্রের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।
  • রেলগাড়ি, টেলিগ্রাফ ও ছাপাখানার প্রচলন ঘটে।
  • মুসলমানদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে।
  • ইংরেজি ও আধুনিক শিক্ষা গ্রহণে মুসলমানরা সচেতন হয়ে ওঠে।

বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল বিষয়ক পোস্ট টি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন ।

Leave a Comment