বাবর কি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন

আজকে আমরা বাবর কি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তা নিয়ে আলোচনা করছি ।

বাবর কি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন

ভূমিকা – মুঘল সাম্রাজ্যের স্থাপিয়তা বাবরের জীবন বড়োই বৈচিত্রময় । এশিয়ার দুজন শ্রেষ্ট বীর তৈমুর লং ও চেঙ্গিস খান সঙ্গে তার রক্তের সম্পর্ক ছিল । বাবরের পিতা ওমর শেখ মির্জা মধ্য এশিয়ার অন্তর্গত ফারগানা নামক ক্ষুদ্র রাজ্যে রাজত্ব করেন । 1483 খ্রিস্টাব্দে বাবরের জন্ম হয় । মাত্র 11 বছর বয়েসে পিতৃহীন হয়ে বাবর সিংহাসনে আরোহন করলেও কিছুদিনের মধ্যে রাজ্য চুত্য হন । পরবর্তী কালে 1504 খ্রিস্টাব্দে তিনি কাবুল অধিকার করেন এবং ভারতবর্ষের দিকে তার দৃষ্টি পড়ে । ভারতের তৎকালীন অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সুলতানী সাম্রাজ্যের দূর্বলতা বাবরকে ভারত জয়ের সুযোগ করে দেয় ।

বাবর কি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিল

অত্যাচারী ইব্রাহীম লোদীর কু শাসনে রাজ্যের ওমরাহরা উত্যক্ত হয়ে বাবরকে ভারত আক্রমণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানায় । এই ওমরাহ দের মধ্যে পাঞ্জাবে পরাক্রান্ত দৌলত খা লোদীর নাম উল্লেযোগ্য । 1524 খ্রিস্টাব্দে এই আমন্ত্রেণ  সাড়া দিয়ে বাবর নিজ সৈন্য নিয়ে লাহোরে উপস্থিত হন । কিন্তু দৌলত খা ও তার অনুগামীরা অবিলম্বে বুঝতে পারেন যে , বাবর ভারত জয় করতে চান – নিছক লুণ্ঠন তার উদ্যেশ্য নয় । আওহানকারিরা তখন বাবরের বিরুদ্ধাচরণ করে । এই বিরুদ্ধাচরণ এর ফলে বাবর সাময়িক ভাবে নিরস্ত্র হলেও 1526 খ্রিস্টাব্দে আবার ভারত আক্রমণ করে দিল্লির দিকে আগ্রাসন হয় । পানিপথ নামক স্থানে বাবরের 12000 সৈন্য ও গোলন্দাজ বাহিনী ইব্রাহীম লোদীর 1 লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী কে পরাস্থ করেন । ইব্রাহীম লোদী পরাজিত ও নিহত হন । এই যুদ্ধে জয়লাভ এর ফলে বাবর দিল্লি ও আগ্রা দখল করেন এবং মোঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় ।

বাবর দিল্লি অধিকার করলেও তখন ভারতের বৃহৎ ভৌগোলিক সীমায় নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি । ভারতবর্ষের তৎকালীন শক্তিশালী শাসক রানা সংগ্রাম সিংহ পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবরের বিরোধিতা করেনি । তিনি আশা করেছিলেন যে , লোদী বংশের পতন হলেও আফগান সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ওপর এক নতুন হিন্দু সাম্রাজ্য স্থাপন করবেন । কিন্তু বাবর তৈমুর লং এর ন্যায় কেবলমাত্র লুণ্ঠন অভিপ্রায় ই ভারত আক্রমণ করেননি । এমত অবস্থায় সংগ্রাম সিংহ ও বাবরের সঙ্গে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে । আগ্রা নিকট খানুয়ার নামক স্থানে মোঘল ও রাজপুত রা পরষ্পরের শক্তি পরীক্ষায় অগ্রসর হয় । রাজপুত বাহিনী অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করলেও বাবরের রণ কৌশল ও অগ্নেয়াস্ত্র এর নিয়েই পরাজিত হয় 1527 খ্রিস্টাব্দে । খনুয়ার যুদ্ধ ভারত ইতিহাসের গতি পরিবর্তিত করেছিল । ফলাফলের দিক থেকে এর গুরুত্ব পানিপথের প্রথম যুদ্ধের তুলনায় অনেক বেশি। খানুয়ার যুদ্ধ বাবর রাজপুত শক্তিকে চূর্ণ করে মোঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি সূদৃহ করে ।

আরও পড়ুন – বক্সারের যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল এবং গুরুত্ব

খামুয়ার যুদ্ধের পরেই বাবর সাম্রাজ্য বিস্তারের উদ্যেশ্যে সৈন্য নিয়ে বিহারের দিকে যাত্রা শুরু করেন । একে একে এলাহবাদ , বারাণসী , চুনার জয় করে ঘর্ঘরা নদীর তীরে এসে উপস্থিত হন । 1529 খ্রিস্টাব্দে ঘর্ঘরার যুদ্ধে বাবর সম্মিলিত আফগান সামন্তদের সৈন্যবাহিনী কে বিধ্বস্ত করে বিহার জয় করেন । বাংলার সুলতান নসরৎ শাহের সঙ্গে তিনি সন্ধি করেন, ফলে বাবর বাংলাদেশ আক্রমণ করেনি ।

পানিপথ, খানুয়া ও ঘর্ঘরার যুদ্ধে জয় লাভ করে বাবর হিন্দুস্থানের এক বিরাট অংশের ওপর মোঘল আধিপত্য স্থাপন করেন । বাবরের সাম্রাজ্য অক্ষুনদীর তীর থেকে ঘর্ঘরা নদী এবং হিমালয় থেকে গোয়ালিয়র পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয় ।

বাবর ছিলেন মধ্য যুগীয় এশিয়ার এক অনন্য সাধারণ চরিত্র এবং দুঃসাহসিক চমকপ্রদ ব্যক্তিত্বের অধিকারী । তিনি আত্মবিশ্বাস ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির ও অসাধারণ সামরিক কৌশলের দ্বারা ভারতবর্ষ জয় করেছিলেন । সামান্য সৈনিক হিসেবে জীবন শুরু করলেও অসাধারণ কর্মদক্ষতার গুণে ভারতে বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিলেন ।  পানিপথ ও খানুয়ার যুদ্ধে তার সামরিক প্রতিভার পরিচয় মেলে । ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন দয়ালু ও বন্ধুবৎসল ।

বাবর ভারতের অধিকৃত অঞ্চলে সুষ্ঠ শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের কোনো চেষ্টা করেনি । তার বিশাল সাম্রাজ্য কোনো রাজনৈতিক শাসনতান্ত্রিক অথবা বিচারবিভাগীয় শৃঙ্খলা স্থাপিত হয়নি । তার আমলে পূর্বতন আফগান শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিরাজমান ছিল । মধ্যযুগের সামন্ত প্রথার কুফল দুর করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি ।

আরও পড়ুন – বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল আলোচনা কর

উপসংহার – পরিশেষে বলা যায়  কিছু সমালোচনার অবকাশ থাকলেও বাবর ছিলেন অনন্য সমরপ্রতিভা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন বীর । তিনি ছিলেন কবি ও সঙ্গীতজ্ঞ শিল্পরসিক ও নৈশর্গ প্রেমিক । ঐতিহাসিক লেনপুল মন্তব্য করেছেন যে , ” বাবর ছিলেন মধ্যে এশিয়ার ভারত লুন্ঠনকারী তৈমুর ও আকবর এর সুবিন্যস্ত ভারত সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি যোগসূত্র “

সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশুনা করার জন্য আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত হন

বাবর সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন ও উত্তর –

বাবরের সম্পূর্ণ নাম কি

বাবরের সম্পূর্ণ নাম জাহিরুউদ্দিন মহম্মদ বাবর

বাবরের জন্ম কবে হয়

বাবরের জন্ম হয় ১৪৮৩ সালের ১৪ ই ফেব্রুয়ারী

বাবর নামের অর্থ কি

বাবর নামের অর্থ  ভাগ্যবান, উপযুক্ত, আনন্দদায়ক, অস্থির, মনোযোগী

বাবরের পুত্রের নাম কি

বাবরের পুত্রের নাম হুমায়ূন

Leave a Comment