হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ ছবি সহ

আজকে আমরা হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ ছবি সহ আলোচনা করবো ।

হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ

উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে বা মেরু অঞ্চলে ধীরগতি সম্পন্ন চলমান বিশাল, দীর্ঘস্থায়ী  তুষার বা বরফের স্তুপ কে হিমবাহ বলে। বিজ্ঞানী ফ্লিন্ট এর মতে – হিমবাহ হল এক বিশাল আকৃতির বরফের স্তূপ, যা তুষার জমাট বেঁধে তৈরি হয়ে বিস্তীর্ন অঞ্চল ব্যাপী অবস্থান করছে এবং চলন্ত অবস্থায় রয়েছে বা কোনো এক সময় চলন্ত অবস্থায় ছিল। হিমবাহ দুটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষয় কাজ করে বিভিন্ন ধরণের ক্ষয়জাত ভূমিরূপের সৃষ্টি করে।

হিমবাহের ক্ষয় কার্য ও সঞ্চয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ | Glacier Erosion  And Storage

সার্ক বা করি – হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত রকম ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, সার্ক বা করি হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ । হিমবাহের অত্যাধিক চাপ ও ঘর্ষনের ফলে উপত্যকার উপরের অংশ খুব খাড়াই হয় এবং মধ্য অংশে অনেকটা গর্তের মতো অবনত জায়গার সৃষ্টি হয় । হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে পুরো উপত্যকাটির আকৃতি অনেকটা হাতল ছাড়া ডেক চেয়ারের মতো দেখতে হয় । এই রকম আকৃতিবিশিষ্ট উপত্যকাকে ফরাসি ভাষায় সার্ক এবং ইংরেজিতে কুম বা করি বলে । একটি করির তিনটি অংশ – ক) পেছনের দিকে একটি খাড়া দেওয়াল খ) মধ্যভাগে একটি অর্ধচন্দ্রাকার গর্ত গ) নিম্ন দিকে উঠের কুব্জের মতো একটি অংশ । হিমবাহ গলা জল করিতে জমে হ্রদ সৃষ্টি হলে তাকে করি হ্রদ বলে। উপত্যকা হিমবাহের উৎসক্ষেত্রে ক্ষয়কাজের ফলে সার্কের সৃষ্টি হয় । পার্বত্য উপত্যকাটি যতদিন পর্যন্ত হিমবাহে চাপা থাকে ততদিন সার্ক দেখা যায় না, হিমবাহ সরে গিয়ে উপত্যকাটি বরফযুক্ত হলে তবেই সার্ক দেখা যায় ।

উদাহরণ – হিমালয়, আল্পস প্রভৃতি

ঝুলন্ত উপত্যকা – উপত্যকা হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত রকম ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, ঝুলন্ত উপত্যকা হল তাদের মধ্যে অন্যতম । অনেক সময় একটি প্রধান হিমবাহ উপত্যকার সাথে অনেক গুলি উপ হিমবাহ উপত্যকা এসে মিলিত হতে দেখা যায়। কিন্তু প্রধান হিমবাহ উপত্যকা গুলি গভীর ও চওড়া হওয়ায় উপ হিমবাহ উপত্যকা গুলি একই তলে প্রধান হিমবাহ উপত্যকার সাথে মিলিত হতে পারে না। তাই উপ- হিমবাহ উপত্যকা গুলি প্রধান হিমবাহ উপত্যকার উপর ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে বলে মনে হয়, এই ভাবে ঝুলে থাকা উপ-হিমবাহ উপত্যকা গুলিকে ঝুলন্ত উপত্যকা বলে।

উদাহরণ – হিমালয়ের বদ্রীনাথের কাছে নরপর্বত থেকে নীচের দিকে কুবের নামে এইরকম ঝুলন্ত উপত্যকা হিমবাহ দেখা যায় ।

Read More : পৃথিবীর আবর্তন গতি কাকে বলে। আবর্তন গতির ফলাফল

U- আকৃতির উপত্যকা : হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত রকম ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, U- আকৃতির উপত্যকা হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ । উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ যে উপত্যকার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয় যেখানে হিমবাহের ক্রমাগত পার্শ্বক্ষয় ও নিম্নক্ষয় সমানভাবে হওয়ার ফলে পার্বত্য উপত্যকাটির আকৃতি ইংরেজি ‘U’ অক্ষরের মতো হয়ে যায়, একে ‘U’ আকৃতির উপত্যকা বা হিমদ্রোণী বলে । হিমবাহ কোনো নদী উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলে হিমবাহ ও নদীর একই সঙ্গে ক্ষয়কাজের ফলে বেশিরভাগ হিমদ্রোণী গড়ে ওঠে বলে বিজ্ঞানীরা অভিমত পোষণ করেন । অনেক সময় হিমদ্রোণীর মধ্য হিমবাহ গলা জল জমে হ্রদের সৃষ্টি হয় ।

রসে মাতনে : হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত রকম ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, রসে মাতনে হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ । অনেক সময় উপত্যকার মধ্যে উঁচু ঢিবির মতো কঠিন শিলাখন্ডের ওপর দিয়ে হিমবাহ প্রবাহিত হয় । হিমবাহের ক্ষয় কার্যের ফলে হিমবাহের প্রবাহের দিকে শিলাখন্ডটি মসৃণ এবং তার বিপরীত দিকে অসমতল বা এবড়োখেবড়ো হয়ে যায় । পার্বত্য হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে শক্ত শিলাখন্ডে গঠিত একদিকে মসৃণ এবং আর এক দিকে এবড়োখেবড়ো এইরকম শিলাখন্ড বা ঢিবিকে রসে মোতনে বলা হয়। রসে মোতানে হল পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের ক্ষয়কাজের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।

ক্র্যাগ ও টেল : হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত রকম ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, ক্র্যাগ ও টেল হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ । হিমবাহের গতিপথে কঠিন শিলাস্তরের পিছনে নরম শিলাস্তর থাকলে, অনেক সময় কঠিন শিলাস্তরটি পশ্চাদবর্তী নরম শিলাস্তরটিকে হিমবাহের ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করে । এর ফলে কঠিন শিলাস্তুপটি উঁচু ঢিপির মত আর পেছনের নরম শিলা সরু লেজের মত বিরাজ করে । এই রকম কঠিন শিলাকে ক্রাগ এবং পিছনের ঢালযুক্ত নরম শিলাকে টেল বলে । টেল অংশটি যতই ক্রাগ থেকে দূরে যায়, ততই সরু হয়ে পড়ে ।

এরিটি বা হিমশিরা – হিমবাহের উৎসমুখী ক্ষয়ের ফলে একই পর্বত শৃঙ্গের দুদিকে দুটি করির সৃষ্টি হলে ও তাদের আয়তন ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকলে মধ্যবর্তী সংকীর্ন খাড়া শিরা বা তীক্ষ্ণ ফলকের মতো অংশকে বলা হয় এরিটি। হিমবাহের অত্যাধিক চাপ ও ঘর্ষনের ফলে উপত্যকার উপরের অংশ খুব খাড়াই হয় এবং মধ্য অংশে অনেকটা গর্তের মতো অবনত জায়গার সৃষ্টি হয়

ফিয়র্ড – সমুদ্র উপকূল সংলগ্ন অঞ্চলে হিমবাহের ক্ষয়ের ফলে হিমবাহ উপত্যকা ক্রমস গভীর হতে হতে যদি উপকূলে নিমজ্জিত হয়, তাহলে ওই উপত্যকার বিস্তৃর্ন অংশ জলমগ্ন হয়ে যে উপত্যকার সৃষ্টি হয়, তাকে ফিয়র্ড বলে। পৃথিবীর গভীরতম ফিয়র্ড হল নরওয়ের সজনে ফিয়র্ড।

Read More : জোয়ার ভাটা কাকে বলে, সৃষ্টির কারণ আলোচনা করো

Leave a Comment