১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন এর প্রেক্ষাপট, বৈশিষ্ট্য, শর্ত, ত্রুটি ও গুরুত্ব

হ্যালো বন্ধুরা, আজকে আমরা ভারত শাসন আইন এর প্রেক্ষাপট, বৈশিষ্ট্য, শর্ত, ত্রুটি ও গুরুত্ব গুলি আজকের এই পোস্টে বিস্তারিত আলোচনা করছি । ইতিহাসের এটি একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং প্রশ্নটি পরীক্ষাতে প্রায়ই এসে থাকে তাই প্রশ্নটি মন দিয়ে পড়ুন এবং খাতায় লিখে রাখুন ।

এর আগের পোস্টে আমরা স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম ।

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন এর প্রেক্ষাপট, বৈশিষ্ট্য, শর্ত, ত্রুটি ও গুরুত্ব

১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন এর প্রেক্ষাপট

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ভারতের জাতীয় আন্দোলন নতুন করে পরিচালিত হয় । জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায় । ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ব্রিটিশ সরকার বিরোধী ক্ষোভ সরকারকে একটি বিল পাস করতে বাধ্য করে, এই বিলটি ১৯৩৫ সালে আইনে পরিণত হয় । যা ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন নামে পরিচিত । ১৯৩৫ এর ভারত শাসন আইনের প্রেক্ষাপট বা কারণকে নিম্নলিখিতভাবে তুলে ধরা হল ।

১) মণ্টেগু চেমসফোরড আইনের ব্যর্থতা– ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে মন্টেগু চেমসফোরড সংস্কার আইন ভারতীয়দের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হলে গান্ধীজী পরিচালিত জাতীয় আন্দোলন গণ আন্দোলনের চরিত্র লাভ করে ।

২) বিপ্লবী কার্যকলাপ বৃদ্ধি- এই সময় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিপ্লবীদের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায় । বিপ্লবীদের এই অতি সক্রিয়তায় সরকার আতঙ্কিত হয়ে ওঠে এবং বিকল্প চিন্তা শুরু করে ।

৩) জাতীয়তাবাদের প্রভাব- ১৯২০ ও ১৯৩০ এর দশকে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপ বৃদ্ধি ব্রিটিশ সরকারকে চিন্তায় ফেলে দেয় । সরকার জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করায় এবং ভারতের ব্রিটিশ শাসনের নিরাপত্তা বৃদ্ধির উপায় খুঁজতে থাকে ।

৪) সাইমন কমিশনের প্রতিক্রিয়া- ভারতীয়রা স্বায়ত্বশাসনে উপযুক্ত কি না তা বিচার করে সাইমন কমিশন । ১৯২৮ খ্রীঃ ভারতে আসে, ভারতীয়দের যোগ্যতা নিয়ে খুবই অপমানকর বক্তব্য করায় ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয় ।

এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় নেতৃবৃন্দদের সাথে আলাপ আলোচনার পর “ভারতীয়দের সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য প্রস্তর সমূহ” নামে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে । এরপর ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একটি বিল পাশ করা হয়, যা ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতশাসন আইনে পরিনিত হয় । এই ভারতশাসন আইন কার্যকর হয়েছিল ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ।

ভারত শাসন আইনের শর্ত ও বা বৈশিষ্ট্য

১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইনে একটি মূল কাঠামো ছিল –

১) কেন্দ্রীয় সরকার বা সর্বভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় শর্ত ।

২) প্রাদেশিক সরকার বিষয়ক শর্ত ।

১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইনের কেন্দ্রীয় সরকার বিষয়ক শর্তগুলি হল –

১) যুক্তরাষ্ট্র গঠন- ব্রিটিশ ভারত ও দেশীয় রাজ্যগুলিকে নিয়ে ভারতীয় যুক্ত রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । দেশীয় রাজ্যগুলি ইচ্ছা করলে ওই যুক্ত রাষ্ট্রে যোগদান করতে পারবে । এছাড়াও ছিল ব্রিটিশ শাসনের সরকারের প্রত্যক্ষ শাসনাধীন অঞ্চল ।

) দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা- কেন্দ্রে ৫ বছর মেয়াদি দ্বি-কক্ষ আইনসভা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । এর নিম্নকক্ষ কেন্দ্রীয় আইনসভা ৩৭৫ জন সদস্য নিয়ে যার মধ্যে ২৫০ জন ব্রিটিশ ভারত এবং ১২৫ জন দেশীয় রাজ্যগুলির দ্বারা মনোনীত হওয়ার সুযোগ পায় । উচ্চকক্ষের নাম ছিল কাউন্সিল অফ স্টেট । নিম্নকক্ষের নাম হয় ফ্রেডারেল অ্যাসেম্বলি । উচ্চকক্ষে ২৬০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত যার মধ্যে ১৫৬ জন ব্রিটিশ ভারত ও ১০৪ জন দেশীয় রাজ্যগুলি থেকে মনোনীত হয় ।

৩) কেন্দ্র ও প্রাদেশিক তালিকা- যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যাবস্থার কেন্দ্র ও প্রদেশের ক্ষমতা বণ্ঠনের জন্য তিনটি তালিকা তৈরি করা হয় ।

৪) কেন্দ্রীয় তালিকা- কেন্দ্রীয় তালিকা এর অন্তর্ভুক্ত ছিল সামরিক বিভাগ, বিদেশনীতি ও মুদ্রা ।

৫) প্রাদেশিক তালিকা- প্রাদেশিক তালিকা এর অন্তর্ভুক্ত ছিল শান্তি শৃঙ্খলা, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য ও পুলিশ ।

৬)যুগ্ম তালিকা- এর অন্তর্ভুক্ত ছিল সংবাদপত্র ও মুদ্রণ, দেওয়ানি ফৌজদারি আইন, বিবাহ ও উত্তরাধিকার বিষয় সমূহ ।

বড়োলাট কে ক্ষমতা প্রদান

এই আইনে বড়োলাট কেন্দ্রীয় শাসন পরিচালনা চূড়ান্ত ক্ষমতা পান । সভা আহ্বান ও বাতিল, কোন বিলে সম্মতি দান এবং কিছু স্বেচ্ছাধীন ও স্ববিবেচনা প্রসূত ক্ষমতার অধিকারী হন বড়োলাট ।

সংরক্ষিত ও হস্তান্তরিত বিষয়- কেন্দ্রীয় সরকার এর দপ্তর গুলিকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায় ।

১) সংরক্ষিত বিষয়- দেশরক্ষা, বৈদেশিক নীতি, সৈন্য, মুদ্রা নীতি, আইন শৃঙ্খলা, ধর্ম প্রভৃতির অন্তর্ভুক্ত ছিল ।

২) হস্তান্তরিত বিষয়- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহণ প্রভৃতি মন্ত্রিসভার পরামর্শ ক্রমে গভর্নর জেনারেল পরিচালনার দায়িত্ব পান । কেন্দ্রে দৈত শাসন পরিচালিত হয় ।

৩) মন্ত্রীসভা ও সাম্প্রদায়িক নির্বাচন- বড়োলাট অধিনস্ত একটি মন্ত্রীসভা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । পৃথক পৃথক সম্প্রদায় এর জন্য নির্বাচন ও আইন সংরক্ষণের ব্যাবস্থা করা হয় ।

ভারত শাসন আইনের ত্রুটি

১) ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইনের কংগ্রেস সহ কোন ভারতীয় রাজনৈতিক দলকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি । কারণ এই আইনে ভাইসরয় ও গভর্নরদের হাতে অধিক ক্ষমতা দেওয়া হয় ।

২) ভারতীয়দের ভোটাধিকার প্রসার ঘটানো হয়নি মাত্র ১৯ শতাংশ মানুষ ভোট দানের অধিকার পেয়েছিল

৩) দেশীয় রাজ্যগুলিকে যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক না করায় অনেক রাজ্য যুক্তরাষ্ট্রে যোগদান করেনি ।

৪) সাম্প্রদায়িক নির্বাচন ব্যাবস্থা প্রবর্তন করে এই আইন জাতীয়তাবাদকে আঘাত করে । এমনকি ভারতবাসীকে প্রকৃত স্বায়তবশাসনের অধিকার দেওয়া হয়েছিল না ।

আরও পড়ুন-

গিয়াসুদ্দিন বলবনের নরপতিত্বের আদর্শ ব্যাখা কর

ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার সূচনা ও প্রসার সম্পর্কে লেখ?

চিনের ওপর আরোপিত বিভিন্ন অসম চুক্তি গুলি বিবরণ দাও?

Leave a Comment